Showing posts with label Islam. Show all posts
Showing posts with label Islam. Show all posts

Sunday, April 15, 2012

আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎসগ্রন্থ আল কোরআন

আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎসগ্রন্থ আল কোরআন
মিরাজ রহমান
জ্ঞান-বিজ্ঞানের আধার পবিত্র কোরআন। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক বিষয় সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আলোচনা করা হয়েছে। বিজ্ঞানময় কোরআনের আলোকে পবিত্র কোরআনের বর্ণনা ও আলোচনাকে পাথেয় করে অথবা এভাবে বলা যেতে পারে, পবিত্র কোরআনকে গাইড মেনে আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক কিছুই আবিষ্কৃত হয়েছে। এককথায় বলতে গেলে, আজকে বিজ্ঞান যা আবিষ্কার করছে, সত্য-সঠিকভাবে সেসব বিষয়ের অনেক কিছু পবিত্র কোরআনে আলোচিত হয়েছে এক হাজার ৪০০ বছর আগেই।
কোরআন ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক কখনোই বিরোধপূর্ণ নয়; আমরা আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞানের আলোয় কখনো চিরকালীন এ সত্য আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি, আবার কখনো হয়েছি ব্যর্থ। পবিত্র কোরআন এমন অলৌকিক-অপ্রতিদ্বন্দ্বী গ্রন্থ, যা সর্বপ্রথম যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে ধর্মের সামঞ্জস্য বিধান করেছে; তর্ক, দর্শন এবং বিজ্ঞানের জটিল ও দুর্বোধ্য বিষয়গুলোর অত্যন্ত সহজ-সরল ব্যাখ্যায় আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছে। কোরআন শুধু ধর্মীয় জ্ঞান বা আধ্যাত্মিক শিক্ষার ভাণ্ডারই নয়, এতে রয়েছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ-রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবজাতির সব কর্মকাণ্ডের জন্য সুস্পষ্ট ও সর্বজনীন আদর্শ বা দিকনির্দেশনা। পবিত্র কোরআনই যে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল উৎসগ্রন্থ আলোচন্য প্রবন্ধের মধ্যে বেশ কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে সে বিষয়টিকেই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
এক. জন ডালটন। ১৭৫৫ সালে জন্ম এবং ১৮৪৪ সালে মৃত্যু। প্রখ্যাত ইংরেজ রসায়নবিদ। পৃথিবীব্যাপী জন ডালটনের রসায়নবিষয়ক সমাধান ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও গ্রহণযোগ্য। বিজ্ঞানভিত্তিক ইতিহাসের আলোচনা অনুযায়ী জন ডালটনই প্রথম 'পরমাণুর তত্ত্ব' প্রস্তাব করেছিলেন। যে প্রস্তাবনা বর্তমান সময় পর্যন্তও 'ডালটনের পরমাণুবাদ' হিসেবে পরিচিত। আমরা বলব, এটা ডালটনের নিজস্ব কোনো আবিষ্কার নয়। তিনি কেবল চিন্তা-গবেষণা করেছেন। পরমাণুবাদের এই থিওরি তিনি ধার নিয়েছেন। কোথা থেকে ধার নিয়েছেন? হ্যাঁ, পবিত্র কোরআন থেকে এই চিন্তাকে ধার নিয়েছেন ডালটন। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে এই পরমাণুবাদের আলোচনা স্থান লাভ করেছে।
সুরা ইউনুসের ৬১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেন, 'তোমার রব থেকে জমিন ও আসমানের অণু পরিমাণও গোপন থাকে না এবং এর (অণু পরিমাণ) থেকে ছোট কিংবা বড় কিছু। তবে (এর সব কিছুই) সুস্পষ্ট রয়েছে কিতাবে।
সুরা সাবার ৩ নম্বর আয়াতে একইভাবে আল্লাহ মহান ইরশাদ করেছেন, 'আসমান ও জমিনের অণু পরিমাণ কিংবা তদপেক্ষা ছোট অথবা বড় কিছুই তাঁর অগোচরে নেই; বরং সবই সুস্পষ্ট কিতাবে রয়েছে। একই সুরার ২২ নম্বর আয়াতে রয়েছে, 'বলো, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইলাহ বা উপাস্য মনে করতে; তাদের আহ্বান করো। আসমান ও জমিনে মধ্যে অণু পরিমাণ কোনো কিছুর মালিক নয় তারা।'
সুরা জিলজালের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'অতএব, কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলে, তা সে দেখবে। আর কেউ অণু পরিমাণ খারাপ বা মন্দ কাজ করলে, তা সে দেখবে।'
পবিত্র কোরআনের আলোচ্য আয়াতগুলোর মাঝে অণু-পরমাণুবিষয়ক আলোচনা স্থান পেয়েছে এবং শেষে উলি্লখিত আয়াতের আলোচনায় পরমাণুর সম্পর্কে স্পষ্ট বলা হয়েছে 'একটি পরমাণুর ওজন সমপরিমাণের ভালো কাজ'। জন ডালটনের পরমাণুবাদের মূল থিওরি ছিল এমনটাই।
পাঠক! একটু ভাবুন, ১৪০০ বছর আগে পরমাণুর ভর সম্পর্কে নবী করিম (সা.) কিভাবে নিশ্চিত হয়েছিলেন? নিশ্চিত হয়েছিলেন তিনি পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে। সুতরাং আমরা এখন এ কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, পরমাণুবাদ জন ডালটনের একক আবিষ্কার নয়; পবিত্র কোরআনের নিদের্শনাকে গ্রহণ করে তিনি কেবল সামনে এগিয়েছেন। শোনা যায়, গোপনে এই রসায়নবিদ বিজ্ঞানী (জন ডালটন) কোরআন পাঠ করতেন এবং শেষ জীবনে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
দুই. জেমস ওয়াটসন (১৯২৮-মৃত্যু জানা যায়নি) এবং ফ্রান্সিস ক্রিক (১৯১৬-২০০৪)। উভয়ই মার্কিন বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদদের প্রদান করা তথ্য অনুযায়ী তারা ডিএনএ কাঠামোর প্রথম নির্ভুল মডেল নির্মাণ করেছিলেন। আমরাও স্বীকার করি, তারা তা করেছিলেন; কিন্তু আমরা ঠিক এভাবে বলছি না। আমরা বলতে চাই, এই ডিএনএ কাঠামো জেমস ওয়াটসন বা ফ্রান্সিসের নিজস্ব বা একক কোনো আবিষ্কার নয়; পবিত্র কোরআনের থিওরি ধার নিয়ে তাঁরা এ কাজ করেছেন। কারণ এই ডিএনএ কাঠামো সম্পর্কে তাঁদের সময়ের অনেক আগে নাজিল হওয়া পবিত্র কোরআনে আলোচনায় পাওয়া গেছে। পবিত্র কোরআনে সুরা আর-রাদের ৪ নম্বর আয়াতে ডিএনএ তত্ত্ব সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, 'আর জমিনে আছে পরস্পর পাশাপাশি ভুখণ্ড, আঙুর বাগান, শস্যক্ষেত, খেজুরগাছ, যেগুলোর মধ্যে কিছু একই মূল থেকে উদগত, যেগুলো একই পানি দ্বারা সেচ করা হয়। আর আমি খাওয়ার ক্ষেত্রে একটিকে অপরটির তুলনায় উৎকৃষ্ট করে দিই। এর মাঝে নিদর্শন রয়েছে ওই জাতির জন্য যারা বোঝে।' এই আয়াতের মূল মর্মকথা হলো, আল্লাহ গাছপালা এবং শাকসবজিতে তার তথ্যযুক্ত চিহ্ন রেখে দিয়েছেন।
এ ছাড়া সুরা আন-নাহলের ৬৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মহান ইরশাদ করেছেন, 'আর নিশ্চয়ই চতুষ্পদ জন্তুতে রয়েছে তোমাদের জন্য শিক্ষা। তার পেটের ভেতরের গোবর ও রক্তের মধ্যখান দিয়ে তোমাদের আমি দুধপান করাই, যা খাঁটি এবং পানকারীদের জন্য স্বাস্থ্যকর।'
সুরা মুমিনুন-এর ২১ নম্বর আয়াতেও একইভাবে আল্লাহ মহান বলেছেন, 'আর নিশ্চয়ই গবাদিপশুর মাঝে তোমাদের জন্য রয়েছে শিক্ষণীয় বিষয়।'
গবাদিপশুতে এবং গাছপালার মাঝে তথ্যযুক্ত চিহ্ন রয়েছে- এ কথা বলে ডিএনএ তত্ত্ব আবিষ্কারের পথ উন্মোচিত করে দিয়েছেন আল্লাহ মহান। জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিক সে উন্মোচনাকে কাজে লাগিয়ে এই তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন মাত্র।
তিন. বিজ্ঞানের ছাত্র মাত্র সবারই জানা, স্যামুয়েল মোর্স নামক আমেরিকান বিজ্ঞানী মোর্স কোড আবিষ্কার করেছেন। আমরাও মানি তিনি আবিষ্কার করেছেন এই কোড তত্ত্ব; কিন্তু তিনি কখনোই যেটা স্বীকার করেননি সেটা হচ্ছে; এই আবিষ্কার তিনি কিভাবে করেছেন। তবে হ্যাঁ, আমরা এটা স্বীকার করছি এবং বলছি, মোর্স সাহেব কোরআন পাঠ করে মোর্স কোড তথা টেলিগ্রাফ আবিষ্কার করেছেন। কারণ তার সময়ের অনেক আগেই পবিত্র কোরআনে এই টেলিগ্রাফ বা বার্তাবিষয়ক আলোচনা স্থান লাভ করেছে। পবিত্র কোরআনে সুরা বাকারার ৩৭ নয় আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, 'Then Adam received from his Lord [some] words, and He accepted his repentance. Indeed, it is He who is the Accepting of repentance, the Merciful'
আলোচ্য আয়াতের Then Adam received from his Lord [some] words, এই অংশের বঙ্গানুবাদ করলে এভাবে বলতে হবে, 'আদম লাভ করল তার প্রভুর থেকে সাংকেতিক বার্তা।'
আসমান বা আকাশ থেকে যে বার্তা পৃথিবীতে আগমন করে, একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ মাত্রই বুঝতে সমর্থ হবেন যে সেই বার্তা সাধারণ কোনো বার্তা নয়, তা ছিল সাংকেতিক বা কোডেড বার্তা। তাই এখানে 'প্রভুর বাণী'কে প্রভুর সাংকেতিক বা কোডেড বার্তা হিসেবে ধরাটাই যেকোনো বিবেকবান এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের উচিত।
সুতরাং আমরা বলতে চাই, মোর্স কোড তথা টেলিগ্রাফের মূল আবিষ্কারক স্যামুয়েল মোর্স নন; তিনি কেবল গবেষণা করেছেন এবং পবিত্র কোরআনের থিওরিকে কাজে লাগিয়েছেন।
চার. আলবার্ট আইনস্টাইন। পৃথিবীখ্যাত বিজ্ঞানী। আইনস্টাইনের ব্যাপারে বলা হয়, নবীজি (সা.)-এর পর পৃথিবীর মানুষের মধ্যে মস্তিষ্কের সবোঁচ্চ ব্যবহারকারী ব্যক্তিত্ব হলেন তিনি। ১৮৭৯ তাঁর জন্ম এবং মৃত্যু ১৯৫৫ সালে। জার্মান বংশোদ্ভূত মার্কিন এই পদার্থবিজ্ঞানী আপেক্ষিকতাবাদসহ বেশ কিছু তত্ত্বের আবিষ্কারক। আইনস্টাইন এই আপেক্ষিকতাবাদকেও আমরা মূলত এককভাবে তাঁর আবিষ্কার বলে মানতে রাজি নই। কারণ এই আপেক্ষিকতাবাদ সমপর্কে আইনস্টানের জন্মেরও অনেক আগে নাজিল হওয়া পবিত্র কোরআনে আলোচনা স্থান লাভ করেছে। অন্য বিভিন্ন বিজ্ঞানীর মতো আইনস্টাইনও পবিত্র কোরআন রির্সাচ করেছেন এবং এ কোরআন থেকে থিওরি গ্রহণ করে আপেক্ষিকতাবাদ সৃষ্টি করেছেন। চলুন তাহলে দেখি পবিত্র কোরআন এই আপেক্ষিকতাবাদ সম্পর্কে কী বলেছে।
পবিত্র কোরআনের সুরা মাআরিজের ৪ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন, 'ফেরেশতা ও রুহ এমন একদিনে আল্লাহর পানে ঊর্ধ্বগামী হয়, যার পরিমাণ ৫০ হাজার বছর।' আলোচ্য আয়াতের মধ্যে আল্লাহ মহানের একদিন=মানুষের ৫০ বছর।
এ ছাড়া সুরা আস-সাজদার ৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মহান ইরশাদ করেছেন, 'তিনি আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত সব কাজ পরিচালনা করেন। তারপর তা একদিন তাঁর কাছে উঠবে। আর সেদিনের পরিমাণ হবে তোমাদের গণনায় হাজার বছর।' এই আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী বলতে হবে, আল্লাহ মহানের একদিন=মানুষের এক হাজার বছর।
পবিত্র কুরআনে আপেক্ষিক তত্ত্বের কথা বলা হয়েছে, খালি একটু খুঁজে বের করার মানসিকতাটা প্রয়োজন। আর এ কাজটিই করেছেন আইনস্টাইন। পবিত্র কোরআনের থিওরি গ্রহণ করে পৃথিবীর মানুষকে শুনিয়েছেন আপেক্ষিক তত্ত্বেও কথা। এ ছাড়া হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.)-এর মিরাজে গমন করার অলৌকিক এই ঘটনার মাঝে আপেক্ষিক তত্ত্বেও বিরাট খোরাক রয়েছে। পবিত্র কোরআনের ভাষায় বললে এভাবেই বলতে হয়, চিন্তাশীল মানুষের জন্য এর মাঝে রয়েছে যথেষ্ট চিন্তার খোরাক ও জোগান।
পাঁচ. চার্লস ডারউইন। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী। বিবর্তনবাদের তত্ত্ব আবিষ্কার করার জন্য দুনিয়াব্যাপী বিখ্যাত তিনি। ঠিক আছে, আমরাও মানছি তাঁর এই আবিষ্কার। তিনিই প্রথম পৃথিবীর মানুষকে শুনিয়েছেন বিবর্তনবাদের কথা। কিন্তু এই বিবর্তনবাদের চিন্তা তার মাথায় কিভাবে এসেছিল? কোথা থেকে পেলেন তিনি এই থিওরি? তা কিন্তু আমরা কখনো ভাবিনি। হ্যাঁ, এবার শুনুন তাহলে, পবিত্র কোরআন পড়েই তিনি প্রথম বিবর্তনবাদের প্রাথমিক সূত্র বুঝতে সক্ষম হন এবং পবিত্র কোরআনের থিওরির ওপর ভর করে বিবর্তনবাদের সূত্র আবিষ্কার করেন।
যদিও এখনো মুসলিম বিজ্ঞানীদের কাছে তার এই বিবর্তনবাদ সূত্র গ্রহণযোগ্য কোনো মতামত নয়, তবুও আমরা দেখাতে চাই যে তিনি যা বলেছেন পবিত্র কোরআন থেকেই বলেছেন। এবং এই বলার সাহস গ্রহণ করেছেন কোরআন থেকে।
পবিত্র কোরআনে সুরা বাকারার ৬৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মহান ইরশাদ করেছেন, 'আর তোমাদের মধ্যে যারা শনিবারের ব্যাপারে সীমা লঙ্ঘন করেছিল, তাদের অবশ্যই তোমরা জানো। অতঃপর তাদের আমি বললাম, তোমরা নিকৃষ্ট বানর হযে যাও।' সুরা মায়েদার ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক আরো বলেছেন, 'বলো, আমি কি তোমাদের আল্লাহর কাছে পরিণতির বিচারে এর চেয়ে মন্দ কিছুর সংবাদ প্রদান করব? যা ওই সব লোকের পথ, যাদের আল্লাহ লা'নত দিয়েছেন এবং যার ওপর তিনি রাগান্বিত হয়েছেন। আর তাদের মধ্য থেকে বাদর ও শূকর বানিয়েছেন এবং তারা তাগুতের উপাসনা করেছে। তারাই অবস্থানে মন্দ এবং সোজা পথ থেকে সর্বাধিক বিচ্যুত।' এ ছাড়া সুরা আরাফের ১৬৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মহান বলেছেন, 'অতঃপর যা থেকে তাদের নিষেধ করা হয়েছিল, তা থেকে তারা যখন সীমা লঙ্ঘন করল; তখন আমি তাদের বললাম, তোমরা নিকৃষ্ট বানর হয়ে যাও।'
পবিত্র কোরআনের আলোচিত আয়াতসমূহের ওপর ভর করে ডারউইন বিবর্তনবাদের সূত্র আবিষ্কার করেছেন।

ইমাম আল-গাজ্জালি ও তাঁর চিন্তাধারা

ইমাম আল-গাজ্জালি ও তাঁর চিন্তাধারা মাহমুদ আহমদ সুমন
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পথহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্য এবং পৃথিবীর বুক থেকে সব অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অন্যায়, অসত্য, শোষণ, জুলুম, অবিচার, ব্যভিচার, শিরক, কুফর, কুসংস্কার এবং মানব রচিত মতবাদ ও মতাদর্শের মূলোৎপাটন করে আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা তথা খিলাফত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে প্রত্যেক জাতিতে যুগে যুগে লক্ষাধিক নবী-রাসুলকে খোদাতায়ালা পাঠিয়েছেন। হজরত রাসুল করিম (সা.) ও তাঁর চার খলিফার মৃত্যুর পর পথহারা মানুষের সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্য প্রতি যুগেই ঐশী জ্ঞানে সমৃদ্ধ এক বা একাধিক আউলিয়ায়ে কেরাম ও ধর্ম সংস্কারকের আবির্ভাব ঘটেছে। এসব আউলিয়ায়ে কেরাম ও ধর্ম সংস্কারকরা নতুন কোনো মত বা মতাদর্শ প্রচার করেননি। তাঁরা সবাই বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নির্দেশিত পথে এবং তাঁরই আদর্শের দিকে আহ্বান করেছেন। আউলিয়ায়ে কেরাম ও ধর্ম সংস্কারকদের চরিত্র, স্বভাব ও সাধারণ জীবনযাত্রা দেখে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ ফিরে আসবে সত্য-ন্যায়ের পথে। হজরত ইমাম গাজ্জালি (রহ.) ছিলেন তাঁদেরই একজন।
ষষ্ঠ হিজরি শতাব্দীতে মানুষ অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুফর, শিরক, বিদআত, কুসংস্কার ও নানাবিধ পাপকাজে লিপ্ত হতে শুরু করেছিল। অন্যদিকে শিক্ষিত যুবসমাজ পাশ্চাত্যের অমুসলিম দার্শনিকদের ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে ইসলামের সত্য পথ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল, তখন পৃথিবীতে সত্যের আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হন হজরত ইমাম আবু হামেদ গাজ্জালি (রহ.)। তিনি ইরানের খোরাসান প্রদেশের অন্তর্গত তুস নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল এ ইরানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন শেখ সাদী (রহ.), মহাকবি ফেরদৌসি (রহ.), আল্লামা হাফিজ (রহ.), আল্লামা রুমি (রহ.) এদের মতো মুসলিম মনীষীরা। ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর প্রকৃত নাম আবু হামেদ মোহাম্মদ গাজ্জালি। কিন্তু তিনি ইমাম গাজ্জাল নামেই খ্যাত। গজ্জাল শব্দের অর্থ হচ্ছে সুতা কাটা। এটা তাঁর বংশগত উপাধি। কারো মতে, তাঁর পিতা মোহাম্মাদ কিংবা পূর্বপুরুষরা সম্ভবত সুতার ব্যবসা করতেন। তাই তাঁর উপাধি হয়েছে গাজ্জালি।
তাঁর পিতা ছিলেন দরিদ্র এবং শৈশবেই তিনি তাঁর পিতাকে হারান। পিতার মৃত্যুতে তিনি নিদারুণ অসহায় অবস্থায় পড়েন; কিন্তু সাহস হারাননি। জ্ঞান লাভের প্রতি ছিল তাঁর খুব আগ্রহ। তৎকালীন যুগের বিখ্যাত আলেম হজরত আহমদ ইবনে মুহাম্মদ বারকানী এবং হজরত আবু নসর ইসমাইলের কাছে তিনি কোরআন, হাদিস, ফিকাহ ও বিবিধ বিষয়ে অস্বাভাবিক জ্ঞান লাভ করেন। কিন্তু এতে তিনি তৃপ্তি বোধ করলেন না। জ্ঞান অন্বেষণের জন্য পাগলের মতো ছুটে যান নিশাপুরের নিজামিয়া মাদ্রাসায়। তৎকালীন যুগে নিশাপুর ছিল ইসলামী জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যে সমৃদ্ধ ও উন্নত। এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সর্বপ্রথম ও পৃথিবীর বৃহৎ নিজামিয়া মাদ্রাসা। সেখানে তিনি ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আবদুল মালিক (রহ.)-এর কাছে ইসলামী দর্শন, আইন ও বিবিধ বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন।
আবদুল মালিক (রহ.)-এর মৃত্যুর পর তিনি চলে আসেন বাগদাদে। এখানে এসে তিনি একটি মাদ্রাসায় অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হোন এবং বিভিন্ন জটিল বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনে তাঁর সুখ্যাতি আস্তে আস্তে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে তিনি আল্লাহকে পাওয়ার জন্য এবং আল্লাহর সৃষ্টির রহস্যের সন্ধানে ধনসম্পদ ও ঘরবাড়ির মায়া-মমতা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন অজানা এক পথে। প্রায় ১০টি বছর দরবেশের বেশে ঘুরে বেড়ান দেশ থেকে দেশান্তরে। আল্লাহর ইবাদত, ধ্যানমগ্ন, শিক্ষাদান ও জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দেন দিন-রাত। জেরুজালেম হয়ে চলে যান মদিনায়। বিশ্বনবীর রওজা মোবারক জিয়ারত করে শেষে চলে আসেন মক্কায়। হজব্রত পালন করেন। এর পর চলে যান আলেকজান্দ্রিয়ায়। সেখানে কিছু দিন অবস্থান করে আবার ফিরে আসেন মাতৃভূমিতে।
হজরত ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক জ্ঞান ছিল অত্যন্ত গভীর। আল্লাহর স্বরূপ ও সৃষ্টির রহস্য তিনি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর মতে, আত্মা ও সৃষ্টির রহস্য এবং আল্লাহর অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিক যুক্তিতর্কে মীমাংসা করার বিষয় নয়। বরং এরূপ চেষ্টা করাও অন্যায়। আল্লাহর অস্তিত্ব ও সৃষ্টির রহস্য অনুভূতির বিষয়। পরম সত্য ও অনন্তকে যুক্তি দিয়ে বোঝার কোনো অবকাশ নেই। তাঁর মতে, যুক্তি দিয়ে আপেক্ষিকতা বোঝা যায় মাত্র। তিনি সব প্রশ্নে মীমাংসা করেছেন কোরআন, হাদিস ও নিজের বিবেক-বুদ্ধির সাহায্যে। আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ধর্মের প্রতি তাঁর আস্থা ছিল পর্বতের মতো অটল ও সুদৃঢ়। ধর্ম ও দর্শনে তাঁর ছিল প্রভূত জ্ঞান। ধর্ম ও যুক্তির নিজ নিজ বলয় তিনি নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, 'আত্মা কখনো ধ্বংস হয় না; কিন্তু দেহ ধ্বংস হয়। আত্মা মৃত্যুর পর জীবিত থাকে। হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে আত্মার কোনো সম্পর্ক নেই, হৃৎপিণ্ড একটি মাংসপিণ্ড মাত্র, মৃত্যুর পরও দেহে এর অস্তিত্ব থাকে। কিন্তু আত্মা মৃতদেহে অবশিষ্ট থাকে না। মৃত্যুর পর আত্মার পরিপূর্ণ উৎকর্ষ ও মুক্তি সম্ভবপর হয়ে থাকে।' তিনি ইসলামী জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যে ইসলামের পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছেন।
হজরত ইমাম গাজ্জালি (রহ.) ছিলেন ধর্ম, আদর্শ ও উন্নত নৈতিকগুণের মূর্তিমান প্রতীক। তিনি চাইতেন সবাই যেন প্রকৃত ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে জীবন পরিচালিত করে। হজরত ইমাম গাজ্জালি (রহ.) সমাজের নানাবিধ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সর্বদা প্রতিবাদ করে যেতেন। খোদাতায়ালার ইবাদতে তিনি দিনরাত মশগুল থাকতেন। লোকদের উপদেশ দিতেন এক খোদার ইবাদত করার, কখনো যেন খোদার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করেন। এ ছাড়া হজরত ইমাম গাজ্জালি (রহ.) খুবই সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন। মৃত্যুর দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে তিনি ফজরের নামাজ আদায় করেন। তারপর নিজ হাতে তৈরি করা কাফনের কাপড়খানা বের করে বলেন, 'হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। তুমি তো রহমান এবং রহিম। হে আল্লাহ, একমাত্র তোমাকে পাওয়ার জন্য এবং তোমার স্বরূপ বোঝার জন্যই আমি সব আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে ঘুরে ফিরেছি বছরের পর বছর এবং এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তরে। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।' এরপর তিনি কাফনের কাপড় পরিধান করেন এবং পা দুখানা সোজা করে শুয়ে পড়েন এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বিশ্ব বিখ্যাত এই আউলিয়া ও ধর্মসংস্কারক চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন মুসলিম জাহানে।

ইসলামে মানবসেবা ও মানবপ্রেম

ইসলামে মানবসেবা ও মানবপ্রেম
মুফতি খালিদ সাইফুল্লাহ রহমানী
ইসলাম মানবতার ধর্ম। মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গল কামনায় ইসলাম দিয়েছে যুগপৎ ঘোষণা। এ ক্ষেত্রে ইসলামের দ্বার সর্বদাই উন্মোচিত। সত্যি বলতে কি, এ বিষয়ে ইসলাম যে পদক্ষেপ ও পদ্ধতি বাতলে দিয়েছে, তা বিশ্বে আজও চিরভাস্বর হয়ে আছে। যদি সেদিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহলে দেখতে পাব ইসলাম কী বলে? মুসলিম শরিফের এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'মুসলিম জাতি এক ব্যক্তির ন্যায়। এক দেহের কোনো অঙ্গ ব্যথিত হলে সারা শরীর বা অঙ্গই সে ব্যথা উপলব্ধি করতে পারে। তেমনি এক চোখে ব্যথা হলে সারা শরীরেই সে ব্যথার একটা প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এমনিভাবে মাথায় ব্যথা হলে সারা দেহেই সে ব্যথার প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে যায়।'
আলোচ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব মুসলমানকে এক কাতারে শামিল করে এক দেহ বা এক শরীর বলেছেন। বোঝা গেল, সবাই এক দেহ, এক শরীর ও এক মন, কেউ কারো থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সবাই একই গোষ্ঠী এবং শ্রেণীভুক্ত। আরো বোঝা গেল, আমার একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে গোটা শরীরেই সেই ব্যথা অনুভব করি। তদ্রূপ কোনো মুসলমান ভাইবোন যদি ব্যথিত বা অসুস্থ হয়, সে ক্ষেত্রেও মনে করতে হবে আমারই কোনো অঙ্গ অসুস্থ হয়েছে, ব্যথিত হয়েছে।
আমি নিজকে যতটুকু ভালোবাসি। নিজ দেহের যেমন যত্ন নিই, পরিচর্যা করি, অবহেলা করি না- তেমনি অন্যের প্রতিও অবহেলা দেখানো যাবে না। মানুষের প্রতি দয়াশীল হতে হবে, মন উজাড় করে মানুষকে ভালোবাসতে হবে। পরিপূর্ণ সহানুভূতি আর সুহৃদ্যতার দ্বারা মানবসেবায় এগিয়ে আসতে হবে। সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে পরের ওপর দয়ার্দ্র হতে হবে। এ ব্যাপারে অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে- 'তোমরা দুনিয়াবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানবাসী তথা মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।' (তিরমিজি শরিফ)
মানুষ মানুষের জন্য। এক মানুষ অপর মানুষের দয়া-সহানুভূতি ছাড়া চলতে পারে না। মানুষ যদি চায় যে সে অপরের কাছ থেকে ভালোবাসা ও দয়া পাবে, তাহলে তাকেও অকৃত্রিমভাবে মানুষকে ভালোবাসতে হবে। মানুষকে ভালোবাসলে আল্লাহ খুশি হন। মানুষের ভালোবাসা ছাড়া, মানবসেবা ছাড়া আল্লাহর ভালোবাসা ও তাঁর দয়ার কথা চিন্তাও করা যায় না। ওপরে বর্ণিত হাদিস এ কথারই সাক্ষ্য বহন করে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানবতার আদর্শ শিক্ষা দানকল্পে অপর এক হাদিসে ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের থেকে একমাত্র দয়ালু বান্দাদের প্রতিই দয়া করে থাকেন। (বুখারি শরিফ)।
মানুষের সেবা করলে আল্লাহ আমাদের প্রতি দয়া করবেন। বিপদগ্রস্ত অসহায় অভাবী দরিদ্র অনাথের সেবায় এগিয়ে এলে, তাদের ব্যথায় ব্যথিত হলে, দুঃখে দুঃখিত হলে আল্লাহ তায়ালাও আমাদের প্রতি দয়া করবেন, আমাদের বিপদ দূর করে দেবেন এবং অভাব মোচন করে দেবেন। আর যদি আমরা মানুষের কল্যাণকামিতার পরিবর্তে মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টায় সচেষ্ট থাকি, কিভাবে অপরকে আটকানো যায়, তা নিয়ে ভাবতে থাকি, তাহলে আল্লাহ তায়ালাও আমাদের আটকে দেবেন। মানবপ্রেমের দুয়ার সবার জন্যই খোলা রাখতে হবে, আপন-পর সবাই এ ক্ষেত্রে সমান। মানবতার সেবা সবার জন্য সমান রেখে সমাজের সর্বশ্রেণীর লোককে এক কাতারে শামিল করতে হবে। এমনকি যারা বেশি অভাবী এবং দূরের আত্মীয় বা প্রতিবেশী তাদের অধিকার বেশি রাখতে হবে। বিশেষভাবে সমাজের এতিম মিসকিন, একেবারে অসহায় যারা, যাদের ভরণপোষণের দায়ভার নেওয়ার তেমন কেউ নেই। এ ধরনের মানুষের পাশে সব সময় থাকতে হবে।
এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন 'আমি এবং এতিমের তত্ত্বাবধানকারী এ দুজন বেহেশতের এ রকম পাশাপাশি থাকব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর শাহাদাত আঙুল এবং বৃদ্ধাঙ্গুল দ্বারা ইশারা করে দেখালেন, এ হাদিসে এতিমের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনকারী বা তত্ত্বাবধানকারীর প্রতি কত সৌভাগ্যের কথা এসেছে যে সে ব্যক্তি আল্লাহর পেয়ারা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে পাশাপাশি বেহেশতে থাকবে। অনেক অনেক সৌভাগ্যের ব্যাপার, আমাদের সমাজের কয়জন এমন আছি, যারা অসহায় এতিমের খোঁজখবর নিই, খুবই নগণ্যসংখ্যক হবে। এমনিভাবে এতিমের প্রতি মমত্ববোধ প্রদর্শন করার ব্যাপারে অপর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন 'যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের আশায় কোনো এতিমের মাথায় হাত বুলাবে, যেসব চুলের ওপর দিয়ে তার হাত অতিক্রম করবে, তার প্রতিটি চুলের বিনিময়ে ওই ব্যক্তির জন্য নেকি লেখা হবে।
আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতিমের খোঁজখবর নেওয়ার ব্যাপারে এমন মানবতাবাদী ছিলেন যে নিজে স্বয়ং এতিমের তত্ত্বাবধান করতেন এবং বলতেন, 'কেউ যদি এমন এতিম সন্তান রেখে যায়, যার কোনো প্রতিপালনকারী এ দুনিয়ায় না থাকে, তাহলে এমন এতিমের দায়দায়িত্ব আমি নিয়ে নিলাম। এমনিভাবে সমাজের সব এতিমের দায়িত্ব আমার।' (ইবনে মাজা)। আমাদের সমাজে অনেক নিঃস্ব অসহায়, স্বামীহারা বা বিধবা নারী রয়েছেন কিংবা তালাকপ্রাপ্ত নারী রয়েছেন, যাঁরা খুবই অসহায়। এ ধরনের মহিলার ব্যাপারেও রাসুল (সা.) বিশেষভাবে খোঁজখবর নেওয়ার কথা হাদিসে এসেছে। এ সম্পর্কে আল্লাহর হাবিব (সা.) বলেন, 'যে ব্যক্তি বিধবা ও মিসকিনদের দায়দায়িত্ব গ্রহণ করবে, সে হচ্ছে ওই ব্যক্তির মতো, যে আল্লাহর পথে জিহাদে রত কিংবা ওই ব্যক্তির মতো যে সারা রাত নফল নামাজ পড়ে আর সারা দিন নফল রোজা রাখে।' আলোচ্য হাদিসে বিধবা নারীর প্রতি সহমর্মিতাকারীর ফজিলতের কথা বলা হয়েছে। অথচ আমাদের সমাজে আজ বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত অথবা বৃদ্ধ নারীরা কত নির্যাতনের শিকার। তাদের নিয়ে কতই না অবহেলা আমরা করে থাকি। না খেয়ে, না পরে মারা গেলেও আমরা তাঁদের প্রতি একটু সহানুভূতি দেখাই না। আমরা আবার মানবতাবাদী বলে দাবি করি।
সমাজের সর্বশ্রেণীর মানুষ যদি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর আদর্শ বাস্তব জীবনে অনুসরণ করে, তাহলে পুরো সমাজের চিত্রটাই পাল্টে যাবে। কেননা রাসুল (সা.) যে আদর্শ রেখে গেছেন তাঁর একটি নমুনা পেশ করছি-
হিজরত করে মহানবী (সা.) যখন মাতৃভূমি ছেড়ে মদিনায় আসেন, অনেক সাহাবিই মক্কায় নিজ বাড়িঘর, অর্থকড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব ছেড়ে মদিনায় চলে আসেন। তাঁরা হলেন মুহাজির। তাঁরা এত অসহায় ছিলেন যে মক্কা থেকে একটু দানাপানিও আনতে পারেননি। আহ্, কী করুণই না ছিল তাঁদের সে সময়ের অবস্থা! এর পর মুহূর্তে আল্লাহর রাসুল (সা.) সব আনসার সাহাবিকে ডেকে বললেন, 'তোমাদের সচ্ছলরা এবং সামর্থ্যবানরা যে যা পারো তোমরা প্রত্যেকে একেকজন মুহাজিরের দায়িত্ব গ্রহণ করে নাও। যে কথা, সেই কাজ। পর্যায়ক্রমে ৪৫ জন আনসারি সাহাবি ৪৫ জন মুহাজিরের দায়িত্ব নিয়ে নিলেন। এবং আনসারি সাহাবিদের মানবতাবাদী সহমর্মিতার ফলে মুহাজিররা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেন। বাহ্ কী দারুণ? আল্লাহর মানবতাবাদী রাসুল (সা.) কিভাবে একটি সামাজিক সমস্যার সমাধান দিলেন।
এমনিভাবে আরেকটি পদ্ধতিতে আমাদের সামাজিক অবকাঠামোর রূপই ঘুরিয়ে দিতে পারি। তাহলে আমাদের শহরবাসী একজন যদি গ্রামের অসহায় দুই একজনের দায়িত্ব নিয়ে নিই, তাহলে আমাদের সমাজের অসহায়ত্ব অনেকাংশেই হ্রাস পাবে ইনশাআল্লাহ। সুতরাং এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যেই নিহিত আছে মানবতার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সে পথে চালনা করুন, যে পথে আছে মানবতার কল্যাণ। আমীন।
লেখক : খতিব , মিজমিজি বাতানপাড়া কবরস্থান মসজিদ, সিদ্ধিরগঞ্জ
http://www.kalerkantho.com/index.php?view=details&archiev=yes&arch_date=13-04-2012&type=main&cat_id=1&menu_id=92
EID MUBARAK to everybody